মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১২ রবিউস সানি , ১৪৪১ | ০৫:৫৪ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বৃহস্পতিবারের হরতালে বিএনপির সমর্থন      আগামী জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এখনো আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার বেগম কবিতা খানম       ফার্মগেট এলাকায় শুরু হয়েছে মেট্রোরেলের কাজ       রাজশাহীর জঙ্গি আস্তানায় র‌্যাবের অভিযানে নিহত ৩      তোরাব আলী খালাস, কারাগারে পিন্টুর মৃত্যু      ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ ছাড়লেন মখা আলমগীর      চাঁপাইনবাবগঞ্জে র‌্যাবের অভিযান, নিহত ২       চাঁপাইনবাবগঞ্জে চরে ‘জঙ্গি আস্তানায়’ বিস্ফোরণ      আগামীকাল স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছেন খালেদা জিয়া       স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ৩য় ম্যাচে জিততে হলে বাংলাদেশকে করতে হবে ৩৭০     

X
রবিবার, ২০ জানুয়ারী ২০১৯ ০৫:৪১ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

চাকরির নামে প্রতারণা

img

দেশে যে হারে শিক্ষিত বাড়ছে, সে হারে কর্মক্ষেত্র বাড়ছে না। ফলে অনেকেই বেকার থেকে যাচ্ছে। চাকরি যেন ‘সোনার হরিণ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে পড়ালেখা শেষ হলেও জুটছে না কাঙ্ক্ষিত চাকরি।


বিশেষ করে ব্যাংক, বীমা, এমএলএম কোম্পানি, বিপণন কোম্পানি, মার্কেটিং কোম্পানির নামে বেশি প্রতারণা করা হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাসে, জনসমাগম হয় এমন স্থানে চাকরির আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। এতে পার্ট টাইম চাকরির নামে ছাত্রছাত্রীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হয়। নিয়োগের নামে তাদের কাছ থেকে জামানত বা অন্যান্য খাতের অর্থ নিয়ে সটকে পড়ে। এসব বিষয়কে বেকারদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।শিক্ষিত বেকাররা নিজ জেলায় ব্যর্থ হয়ে চাকরির সন্ধানে ভিড় করছেন রাজধানীতে। এ সুযোগে এক শ্রেণীর প্রতারক চাকরি নামে প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসে আছে। এই ফাঁদে পড়ে অনেকেই প্রতারিত হচ্ছেন। এতে অনেকে চাকরি পাওয়ার আসায় উপরি দিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। কিন্তু মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সোনার হরিণটি।

এদিকে ভুয়া এমএলএম কোম্পানির নামে প্রতারণার ঘটনায় গত বছরের এপ্রিলে ২৩ জনকে গ্রেফতার করেছে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র‌্যাব-১১। তখন প্রতারকদের অবৈধ মালামালসহ উদ্ধার করা হয়েছিল ৩১ জন ভিকটিমকেও। একটি ভুয়া এমএলএম কোম্পানি মাসিক ১৬ হাজার ও এর বেশি টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনটি ভিন্ন প্যাকেজে চাকরি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে যথাক্রমে ২৭ হাজার ১০০, ৩৭ হাজার ১০০ ও ৪৭ হাজার ১০০ টাকা গ্রহণ করে।

পরবর্তী সময়ে প্রশিক্ষণের নামে সপ্তাহখানেক কালক্ষেপণ করে প্রত্যেককে নতুন দুজন সদস্য সংগ্রহের শর্ত দেয়। নতুন সদস্য সংগ্রহ করে দিলে সংগৃহীত টাকার সামান্য কমিশন প্রদান করে। নতুন সদস্য দিতে না পারলে কৌশলের আশ্রয় নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে খালি স্ট্যাম্প ও আপসনামায় জোর করে স্বাক্ষর নিয়ে তাড়িয়ে দেয়। প্রতিবাদ করলে ভাড়াটিয়া লোকজন দিয়ে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতনও করে।

জানতে চাইলে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম যুগান্তরকে বলেন, কারো কাছে এমন কোনো অভিযোগ পেলেই আমরা অভিযান চালাই। আর এর আগেও বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে প্রতারকদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। যারা এসব চাকরির প্রলোভন দেখায় এবং যারা চাকরি প্রার্থী তাদের সচেতন হতে হবে।

অন্যদিকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিরীহ লোকদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করে এক সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। এ চক্রের একটি অংশ রাজধানীতে উইনেক্স ট্রেড কর্পোরেশন লিমিটেড নামে একটি অফিস খুলে চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা করছে। বিভিন্ন জেলার শিক্ষিত ও বেকার যুবকদের চাকরি দেয়ার প্রলোভন দিয়ে ও চাকরির জামানত বাবদ মোট অঙ্কের টাকা রেখে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয় প্রতারকরা।

তাদের ফাঁদে ফেলার পর নিজেদের আত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবদেরকে প্রলোভন দেখিয়ে কীভাবে এই কোম্পানিতে আনতে হবে সেই সম্পর্কে ট্রেনিং দেয়া হতো। পরবর্তী সময় অসহায় যুবকরা কোম্পানির উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করবে না মর্মে টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করে। পরে কোম্পানি তাদেরকে ঘোরাতে থাকে। আর যারা নতুন সদস্য সংগ্রহ করতে না পারত তাদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিদায় করে দেয়া হতো।

পরে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছরের আগস্ট মাসে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের রোবারি প্রিভেনশন টিম বারিধারার উইনেক্স ট্রেড কর্পোরেশন লিমিটেড কথিত অফিসে অভিযান চালায়। পরে সেখান থেকে ১৬ প্রতারককে আটক করে। গত তিন বছরে ওই প্রতিষ্ঠানটি কয়েক হাজার যুবককে প্রতারিত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যার প্রমাণ ওই অফিসে পাওয়া গেছে।

 

এ ছাড়া ২০১৪ সালে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার তৃতীয় সমুদ্রবন্দরে চাকরি দেয়ার নাম করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় একটি চক্র। জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে এ প্রতারণা করা হয়। ১৬ যুবক নিয়োগপত্র পেয়ে চাকরিতে যোগ দিতে গিয়ে দেখে, গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়াই ভুয়া। এভাবে দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের সুযোগ নিচ্ছে কয়েকটি প্রতারক চক্র। কখনও বিদেশে পাঠানোর নামে, কখনও দেশে চাকরি দেয়ার নামে, কখনও ব্যবসায় মুনাফা লাভের নামে এসব চক্র বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এর আগে দেশে আইটিসিএল, ডেসটিনি, যুবক, ইউনিপে-টু হাতিয়ে নিয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

অন্যদিকে ২০১৫ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু প্রকল্পে চাকরি দেয়ার নামে এক প্রতারক চক্র ধরা পড়ে। র‌্যাব-১ রাজধানী সবুজবাগ ও আদাবর এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে। প্রতারকরা ছিল আবদুল খালেক, শফিকুল আলম ও খলিলুর রহমান নয়ন। তারা একটি কোম্পানির নামে ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে বেকার যুবকদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। চায়না মেজর ব্রিজ সিকিউরিটি সার্ভিস নামের একটি কোম্পানির পরিচয়ে এই চক্রটি ১৪০০ চাকরি প্রত্যাশীর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে ৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। আকর্ষণীয় বেতন-ভাতায় এদের ভুয়া নিয়োগপত্র দেয়ার পর তারা যখন চাকরিতে যোগ দিতে যায় তখনই তারা বুঝতে পারে তারা প্রতারণার শিকার। অনন্যোপায় হয়ে প্রতারিতরা বিভিন্ন থানা ও র‌্যাবকে জানায়। র‌্যাব ওই দিন সন্ধ্যায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে। পরে তারা প্রতারণায় জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে।

এদিকে প্রতারকরা চোখের সামনেই এসব চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে যাচ্ছে। কখনও প্রতিষ্ঠিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকায়। আবার কখনও গণপরিবহনে এ সব বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে। সেখানে লেখা আছে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পার্ট টাইম জব। দিনে তিন ঘণ্টা। আর সপ্তাহে চারদিন। বেতন সাত থেকে দশ হাজার টাকা। এমন বিজ্ঞাপন দেখে অনেক শিক্ষার্থী পা বাড়িয়ে নিজেদের সর্বস্ব হারিয়েছেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. জসিম উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ২০১৪ সালে ইন্টার পরীক্ষার রেজাল্ট হওয়ার পর গ্রাম থেকে রাজধানীতে আসি অনার্স পড়ার জন্য। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা তেমন একটা সচ্ছল ছিল না। তাই ঢাকায় থাকতে ও পড়তে নিজে খরচের ব্যবস্থা করতে একটি পার্ট টাইম চাকরি খুঁজতে লাগলাম। একদিন বাসে করে এক বন্ধুর বাসায় যাচ্ছিলাম।

সেখানে দেখি সপ্তাহে তিন দিন ও দিনে চার ঘণ্টা কাজে ১২ হাজার টাকা দেবে বলে একটি বিজ্ঞাপন দেয়। সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা জামানত দেয়ার কথাও বলা হয়। তিনি বলেন, অফিসটি ছিল মালিবাগে। বিজ্ঞাপনে থাকা ঠিকানায় যোগাযোগ করলে চাকরিটা কনফার্ম করে।

কিন্তু কি কাজ করতে হবে জানতে চাইলে তা বলে না। তবে আমি চিন্তা করলাম মাসে ১২ হাজার টাকা পাব, থাকা-খাওয়া ও পড়ালেখা ভালো চালিয়ে নিতে পারব বলে পাঁচ হাজার টাকা ম্যানেজ করে তাদের দেই। এমন আমার মতো আরও ৩০-৪০ জন টাকা দেন। আমাদের ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসের এক তারিখে অফিসে জয়েন্ট করার কথা বলে। আমরা সেভাবে যাই। কিন্তু অফিসে গিয়ে দেখি তালা ঝুলানো। আর বাইরেও কেউ নেই। ততক্ষণে সবাই বুঝতে পারলাম আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি।

আরো খবর